আনিকার মিউটেশন ( সকল পর্ব একত্রে ) | মনির উদ্দিন তামিম

আনিকা এবার এইচ এস সি পরীক্ষা দিবে। খুব ভালোই প্রস্তুতি ছিল তার। কিন্তু হুট করে ওর হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাওয়া দাওয়ার অসুবিধা শুরু হলো।হোস্টেলের কারোর ই পড়াশোনা ঠিক মত হচ্ছিল না ।এর অবশ্য কারণও  আছে । বিশ্বে করোনা ভাইরাসের মহামারী দেখা দিয়েছে যার রেশ এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। এর আগে কখনো আনিকা মহামারী দেখে নি ।কোয়ারেন্টাইন শব্দটিও ওর কাছে নতুন। আনিকার ছোট বেলা থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। সে শুনেছে এই কোভিড-১৯ এ ভাইরাস নাকি শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতি করে থাকে। সারাটাদিন একটা ভয় নিয়ে কাটাতে হচ্ছে আনিকার! নতুন এই ভাইরাস নিয়ে সে তেমন কিছুই জানে না। ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাটি করে দেখল এই ভাইরাসের এখনো কোন ভ্যাকসিনও নেই এখন পর্যন্ত।

মাঝে মাঝে ফোনে ইমতিয়াজের সাথে কথা হয় আনিকার ।আজকেও হলো ।মন খারাপ থাকলে ইমতিয়াজের সাথে কথা বললেই নাকি ওর মনটা ভালো হয়ে যায়।ইমতিয়াজ কে ভাইয়া বলেই সে ডাকে।যদিও হোস্টেলের বান্ধবীরা আনিকাকে এই ব্যাপাটা নিয়ে  প্রায়ই  ক্ষ্যাপায়! আনিকা ওসব কানেই তুলে না।পড়াশোনা রিলেটেড অনেক হেল্প পাওয়া যায় ইমতিয়াজ ভাইয়ার কাছ থেকে।”তাছাড়া ছেলে হিসবেও খারাপ না সে”, মনে মনে ভাবে আনিকা ।

একই এলাকায় বাসা ওদের। ইমতিয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এ পড়ে।দারুণ মেধাবী হিসেবে এলাকায় ইমতিয়াজের নাম ডাক আছে।আনিকার বাবা আর ইমতিয়াজের বাবা একই অফিসে চাকরি করে।  

ফেসবুকের নিউজফিড খুললেই কেবল মৃত্যুর সংবাদ ।পৃথিবীর  বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারছে অনেককে।যাদের বয়স একটু বেশি ও যারা অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় ভুগছে তাঁদের মৃত্যুহার তুলনা মূলক বেশি।এসব খবরে আরো ভয় পেয়ে যায় আনিকা।ফোন হাতে নিতে নিতে আনিকা ভাবে ,”তবে কি  ভাইরাস আক্রমণ করলে  শ্বাসকষ্টের  এই সমস্যার কারণে আমিও মরে যাবো?” বিষণ্ণতায় মনটা ভরে উঠে মেয়েটির।মনে হচ্ছিল  বুকটা একদম ফাঁকা হয়ে গেছে! শূন্যতার এমন অনুভূতি আগে কখনো তার হয় নি।

হোস্টেলের অনেক মেয়েরাই বাড়িতে চলে গেছে ইতোমধ্যে ।দুই এক দিনের মধ্যে হয়তো  গণপরিবহণ ও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন চাইলেও বাড়িতে যাওয়া যাবে না। ইমতিয়াজকে কল দিলো আনিকা।

“হ্যালো, ভাইয়া আমি আনিকা।”

“কি খবর আনিকা, কেমন আছো?”

“জি, ভাইয়া ভালো। আপনি কেমন আছেন?”

“এইতো ভালো। খবরে দেখলাম তোমাদের এইচ এস সি পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়েছে । জানো তো ?”

“হ্যাঁ,ভাইয়া। জানি।আপনি কি ভাইয়া দেশের বাড়ি চলে গেছেন নাকি এখনো ভর্সিটির হলে আছেন ?”

“এখনো হলে আছি, কালকে বাড়ি যাবো ।তুমি  এখনো বাড়ি যাও নি? “

“না ভাইয়া , যাই নি। কার সাথে যাবো ? আগে তো শ্রাবণী আপুর সাথে যেতাম।কিন্তু আপুর  ব্যাংক খোলা তাই উনি যেতে পারবেন না এখন।আমার হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়  খাওয়ারও  অসুবিধা হচ্ছে । আর টেনশনে পড়াও  হচ্ছে না। মনে হচ্ছে  আমি ও  মরে যাবো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।ভয়ে আমার খাবার রুচি ও কমে গেছে ।হ্যালো ভাইয়া, আপনি কি আমাকে শুনছেন?”

“হ্যাঁ, আনিকা আমি শুনছি,তুমি  বলো।”  

“ আমি বেশি কথা বলি , এজন্য কি আপনি মাইন্ড করেন ভাইয়া?  মাইন্ড  করলে আমাকে বলবেন।আমি আর বেশি কথা বলবো না ।” 

মন ভালো নেই আনিকার

প্রতিবারই  আনিকা এই কথা বলে।ইমতিয়াজও অভ্যস্ত হয়ে গেছে আনিকার এই প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে। যদিও ইমতিয়াজের কাছে  ব্যাপারটা মন্দ লাগে না ।মেয়েটি বেশি কথা বললেও  সে  সুন্দর মনের অধিকারী।যারা একটু বেশি কথা বলে তাদের মনে কুটিলতা কম থাকে বলে ইমতিয়াজ জানে।করোনা ভাইরাস  ও মেয়ে মানুষের  মধ্যে  একটা  সাদৃশ্য খুঁজে  পেয়েছে  ইমতিয়াজ । এরা দুই প্রজাতি খুব দ্রুতই মিউটেশন ঘটায়  বা  রূপ বদলায়। যদিও  আনিকা মেয়েটির মাঝে  এমন কিছু সে এখনো লক্ষ্য করে নি ।কিছু সময়ের জন্য ইমতিয়াজ  হারিয়ে গিয়েছিল কল্পনায়।অপরপ্রান্তে এখনো  কথা  বলে যাচ্ছে আনিকা………

( ১ম পর্ব সমাপ্ত )

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ইমতিয়াজ বলল,” এক কাজ করতে পারো,আনিকা। আমি যেহেতু আগামীকাল যাচ্ছি। তুমি চাইলে আমার সাথেই যেতে পারো । বাসের দুইটা টিকেট কাটা আছে আমার।হলের এক বন্ধুর যাওয়ার কথা ছিল আমার সাথে,কিন্তু ও ঢাকায়ই থেকে যাবে ওর ফুপুর বাড়িতে।সো ও যাচ্ছে না।”

“থ্যাংক ইউ সো মাচ ভাইয়া । আপনি অনেক হেল্পফুল ।আপনি আমাকে ম্যসেজে বাস ছাড়ার টাইম ও লোকেশনটা টেক্সট করে দিন।আমি জাস্ট টাইমে উপস্থিত থাকবো।আর হ্যাঁ ভাইয়া, আপনাকে নীল শার্টে ভালো মানায়।বাই।”

খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে আনিকা যে কথাগুলো বলছে তা ইমতিয়াজ অনুমান করতে পারছিল।নীল শার্টের  ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছিল না ইমতিয়াজ ।যদিও সে টিকেট দুটি কাটে নি।টিকেট কেটেছিল একটি।কিন্তু সে চাচ্ছিল না আনিকাকে হতাশ করতে তাই ফোনে বানিয়ে বানিয়ে বন্ধুর আখ্যান বলেছিল।একেই হয়ত বলে প্রত্যুৎপন্নমতি।উপস্থিত বুদ্ধি ইমতিয়াজের আগ থেকেই ভালো । স্কুল কলেজে থাকা কালীন সময়ে  যুক্ত ছিল ডিবেটিং ক্লাবে।ডিবেটিং করতে করতেই ইমতিয়াজের উপস্থিত বুদ্ধি বেড়েছে বলে সে মনে করে।তবে আজকাল পোলাপান  বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ ক্লাবে জয়েন না করে , জয়েন করে “পাবজির টিমে” যেন ISSB না দিয়েই আর্মিতে চান্স  পেয়েছে।ঠিক এই মুহূর্তে ইমতিয়াজের ISSB পূর্ণ রূপ মনে পড়ছে না।  

সহজ  ডট কম। বাসের টিকেট কাটার সবচেয়ে সহজ একটি মাধ্যম।আজকাল মানুষ সার্ভিস গুলো সহজ করে দিয়ে নিজেদের কোম্পানির নাম ও রাখে “সহজ” দিয়ে।আজব সময়।ওদের ওয়েবসাইটে গিয়ে ইমতিয়াজ দেখল তার পাশের সীট টি ফাঁকা নেই।হতাশ হয়ে গেল ছেলেটি।এখন কি বলবে সে আনিকাকে।আনিকাই বা কি ভাববে! ওয়েবসাইটের নিচে দেওয়া ফোন নম্বরে কল দিয়ে বাড়তি ২০০ টাকা দিয়ে কোন মতে ম্যানেজ করলো তার পাশের আসন টি।আজকাল বিকাশেও বকশিস দেওয়া যায়।ভাবা যায়?! 

মনে মনে ইমতিয়াজ  ভাবে,”টাকা দিয়ে এই দেশে অনেক কিছুই পাওয়া যায়।কেবল সুখটাই কেনা যায় না।সুখ কেনা গেলে জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর প্রচুর টাকা পয়সা কামিয়ে তার পর বাকি জীবনের জন্য সুখ কিনে বাড়িতে বসে বসে সুখ উপভোগ করা যেতো।কিন্তু পরক্ষণেই আবার সে ভাবে, আমি যদি অনেক ধনী হই তবে তো আমার সুখ কেনার খরচও বেড়ে ঠিক কতটুকু ধনী হলে কতটুকু  সুখ কেনা যাবে ! যাবে।যার সঠিক অনুপাত হয়ত পৃথিবীর কারোই  জানা নেই।

অনেকইতো কম টাকা নিয়ে সুখে জীবন কাটাচ্ছে  আবার প্রচুর  টাকাও অনেকের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না ,তাদের আরও চাই। চাই চাই  অপ্রাপ্তি  নিয়ে হয়ত একদিন তারা মরেও যায়।তাও তাদের চাই ।মানুষ যখন কোনটা  NEED আর কোনটা Want তা বুঝতে পারে না তখনই  অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।একটা হিসেব ইমতিয়াজ মিলিয়েছে।সেটা হলো,”যারা অল্প টাকায় খুশি হয়ে সুখে থাকে তাঁরা মূলত  NEED ফুলফিল করে আর যারা প্রচুর অর্থ সম্পদ থাকার পরও সুখ খুঁজে পায় না তাঁরা মূলত  Want ফুলফিল করার পেছনে ছুটে।যা আসলেই  কখনো  পূর্ণ করা সম্ভব নয়।এজন্যই তাঁরা অসুখী।” এরকম প্রায়ই কিছু ফিলোসফিকাল প্রশ্ন ইমতিয়াজের মাথায় আসে।কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর যে খুঁজে পেয়েছে আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো সে খুঁজছে।”

আগামীকাল সকাল  ৯ টায় বাস ।নিশ্চই  আনিকা জাস্ট টাইমেই চলে আসবে।জামা কাপড় এখনো  কিছুই  গুছানো হয় নি ইমতিয়াজের।ভার্সিটির হলের এই একটাই সমস্যা।সবাই সবকিছুকে নিজের সম্পত্তি মনে করে।নতুন কোন প্যান্ট শার্ট কিনে আনলে সেটির ভোক্তা হয় রুমের সবাই।চতুর্থ শ্রেণীয় ভোক্তা।সাবান, শ্যাম্পু কিছুই ঠিক মত রাখা যায় না।বডি স্প্রে, তা তো রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথেই রুম স্প্রে হয়ে যায়।

ইমতিয়াজ নীল রঙয়ের শার্টটি  খুঁজে পাচ্ছে না । ইমতিয়াজের এক রুমমেট জানালো, মিনহাজ নিয়ে গেছে। মিনহাজ নিজের সম্পত্তি মনে করে সেটি পরে বাহিরে বেড় হয়েছে। নতুন গালফ্রেন্ড হয়েছে মিনহাজের।ডেটিং এ গিয়েছে সে। সাথে করে নাকি মাস্ক ও নিয়ে গেছে।হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিতে ভুলে নি। তবে সেটি নাকি তাঁর ছিল না ,তা ছিল  পাশের রুমের সোহানের হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

মিনহাজ নিশ্চিত না যে মেয়েটির  সাথে দেখা করতে যাচ্ছে সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা।তাই যাথাযথ  নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই সে হল থেকে বেড় হয়েছে।এমন তো আর না যে সুন্দরী মেয়েদের করোনা ভাইরাস  আক্রমণ করে না ।মিনহাজ ঠিক করল সে মেয়েটির পাশে বসবে ঠিকই কিন্তু অবশ্যই ৩ ফুট ফাঁকা রেখে ।…… সন্ধ্যা  হওয়ার আগেই  মিনহাজ হলে ফিরে আসে।মনটা মিনহাজের খুব খারাপ।হয়ত এটিই ছিল ওই মেয়েটির সাথে মিনহাজের ফাস্ট ও লাস্ট ডেইট।

হলের রুমে ঢুকেই মিনহাজ শার্ট খুলে ইমতিয়াজ কে দিলো।আর  বলল,”তুই বাড়ি যাবি কখন?  আমি জানতাম তুই বাড়ি যাবি তাই তাড়াতাড়ি চলে আসছি ।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে মিনহাজ বলে উঠল,”   ব্যাটা, তোর এই শার্ট  একটা কুফা! অনেক দিন পর একটা গালফ্রেন্ড পাইলাম! এই শার্ট পরে গেছি বলেই ও আজকে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”  মানুষ যখন নিজের দোষ লুকাতে চায় তখন যে দুনিয়ার সকল পন্থা একবার হলেও ট্রাই করে দেখতে চায়। আর এক্ষেত্রে গালফ্রেন্ড চলে যাওয়ার জন্য মিনহাজ দায়ী করছে নীল রঙয়ের শার্ট কে।   

ইমতিয়াজ মজারচ্ছলে বলল,” বন্ধু, শার্টের দোষ না দিয়ে সত্যি করে বলো কি ঝামেলার কারণে তোমার মুখের  উপর পাঁচ আঙ্গুলের দাগ দেখা যাচ্ছে ।”

“সত্যি দাগ এখনো দেখা যাচ্ছে?”

হেসে হেসে উত্তর দিল ইমতিয়াজ, “হ্যাঁ, খুব জোড়ে মেরেছিল বুঝি, বন্ধু?”

“আরে না , সমস্যা হয়েছিল  মেয়েটি আমার জন্য গোলাপ ফুল এনেছিল।আমি তো ওর থেকে ৩ ফুট দূরে বেঞ্চে বসেছি।বুঝিস ই তো  করোনার ভয়। খেয়াল করলাম আমার এই দূরে বসার কারণে ও খুব আন-ইজি ফিল করতেছে।এরপর ও যখন  আমাকে গোলাপ ফুল গুলো এগিয়ে দেয় তখন আমি  করোনা  ভাইরাসে আক্রান্ত  হওয়ার  ভয়ে ফুল  গুলোর উপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে করে দিয়ে তারপর হাতে নেই।ভুলটা ঠিক তখনই হয়। আমি খেয়াল করি নাই যে, ফুলে স্প্রে করার সময় ভুলে কয়েক ফোটা অ্যালকোহল বেসড হ্যান্ড স্যানিটাইজার ওর চোখে  গিয়ে পড়ে। এতেই মেয়েটির চোখ জ্বালা পোড়া শুরু হয়। সেও চিল্লাতে শুরু করে। আশেপাশের অনেক মানুষ জড়ো হয়ে যায়। বিটিভির একটা বিজ্ঞাপনের  মত নিজেকে মনে হচ্ছিল এসিড নিক্ষেপ কারী জলিল, যেন আমি  মিনুকে এসিড মেরেছি ।

মনে মনে ভাবতেছিলাম, মানুষ যদি আমাকে ভুল বুঝে তাহলে গণপিটুনি নিশ্চিত।তারচেয়ে ভালো মেয়েটির কাছে মাপ চাই, যাতে ও সিন ক্রিয়েট না করে।পরে আমি দৌড়ে গিয়ে একবোতল পানি এনে ওর চোখে ঝাপটা দিয়ে দেই।একটু পর যখন  মেয়েটি একটু নরমাল ফিল করল তখন ওকে একটা রিক্সায় উঠিয়ে আপদ বিদাই করতে যাই।ওমা! রিক্সায় উঠেই মেয়েটি কষে আমারে একটা চড় মারে। আমি তো ওখানেই  থ হয়ে যাই।মনে হচ্ছিল আমার কানের টিমপেনিক মেমব্রেন ছিঁড়ে গেছে।শো শো শুনতেছিলাম কিছুক্ষণ ধরে।  

যাওয়ার সময় মেয়েটি আমাকে রাগান্বিত হয়ে  বলল, “আগে সাহসী হও তারপর প্রেম করতে আইসো, ভীরুরা উত্তম প্রেমিক হতে পারে না।নেক্সট যার সাথে প্রেম করতে যাবা , যাওয়ার আগে সাহসী হওয়ার ট্রেইনিং নিয়ে যাবে।নাহলে আজকে তো খেলা থাপ্পর, পরের বার  অন্য কোন মেয়ের লাথি ও খেতে পারো! ভীতুর ডিম কোথাকার!” 

এসব বলতে বলতে বারবার মুখে হাত দিচ্ছিল মিনহাজ।সম্ভবত চড় খাওয়ার শোক এখনো ওকে ভেতর থেকে কাঁদাচ্ছে।  

এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল ইমতিয়াজ।বন্ধুর কষ্টে খারাপ লাগলেও হাসি পাচ্ছিল খুব তার।হাসি থামিয়ে ইমতিয়াজ বলল, “ যা আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়।যা যাওয়ার তা গেছে। গনপিটুনি খাস নাই এইটাই তোর সৌভাগ্য।আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবো,কালকে আমার সকালে বাস আছে।ভরে ঘুম থেকে উঠব!”   

আনিকাকে ফোনে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ কনফার্মেশন হিসেবে পাঠিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ইমতিয়াজ।

“সময়ঃ সকাল ৯ টা ।

বাস স্ট্যান্ডঃ মালিবাগ।

বাসের নামঃ হানিফ পরিবহন।

আসন নম্বরঃ সি-৩ ও সি-৪”

(২য় পর্ব সমাপ্ত) 

সে দিন সকালে আনিকার ঘুম তাড়াতাড়িই ভেঙ্গে গেলো। আগে তার এলার্ম দিয়েও ঘুম ভাঙ্গত না।মোবাইলে আনিকার এলার্ম দেয়ার প্যাটার্নও ছিল অনেক টা এরকম 5AM , 5:02 AM , 5:06 AM, 5:07 AM. যদিও সে বিছানা থেকে উঠত  ৭  টা  থেকে  ৮ টার মধ্যে। কথা দিয়ে কথা না রাখার অভ্যাসটা মানুষ নিজের সাথেই এভাবে প্রতিনিয়ত  চর্চা করে।  নিজের কাছে  ওয়াদা করে সকাল  ৫ টায় উঠবে কিন্তু উঠে  সকাল  ৯  টা বা  ১০ টায়।

তবে  আজকে আনিকার এই  অভ্যাসের ব্যতিক্রম ঘটল। মানুষ পারে না এমন কাজ  খুব কমই  আছে ।সকাল  সকাল ঘুম থেকে উঠার জন্য ইচ্ছা শক্তিটাই আসল।ইমতিয়াজের  সাথে দেখা করার ইচ্ছাটাই আনিকাকে এলার্ম ছাড়া উঠতে বাধ্য করেছে। তাও আবার কাটায় কাটায় ভোর ৫ টায়।  ” সবাই যদি ঘুম থেকে উঠে  কি কি করবে  তা  আগের  রাতে  গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী  লিখে ঘুমায়  তবে  সকাল বেলায়  ঘুম থেকে  উঠার বাড়তি ইচ্ছা শক্তি পেত”, ব্রাশ করতে করতে ভাবে আনিকা। 

হোস্টেলের বান্ধবীরা আনিকার নাম দিয়েছিল “রূপবতী  টয়লেট সিংগার” ।এর পেছনে একগাদা কারণ অবশ্য আছে ।আনিকা তার রূপের প্রশংসা সরাসরি কোন ছেলের কাছ থেকে পায় নি এখনো, যাও পায় তাও ফেসবুক ম্যসেঞ্জারে।কোন এক অজ্ঞাত কারণে জুনিয়র ছেলেরা ওর উপর বেশি ক্রাশ খায়। প্রেমে পড়া ও ক্রাশ খাওয়া এই দুইটা ব্যাপারের পার্থক্য এখনো আনিকার কাছে স্পষ্ট না। ওয়াশরুমে যেতে যেতে আনিকা ভাবে,” এই প্রশ্নটা ইমতিয়াজ ভাইয়াকে করলে কেমন হয়? উনি কি লজ্জা পাবেন ? নাকি অন্য সকল প্রশ্নের মত এটারও উত্তর দিবেন বিজ্ঞের ভান ধরে।” 

ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গাইতে লাগল আনিকা ।তাহসানের “আলো”  গানটা।এটা সে প্রায় গায় ওয়াশরুমে এসে। তবে আজকে ওর কাছে মনে হচ্ছে একটু জোড়েই গাইছে সে। এর কারণ দুইটা । এক, হোস্টেলে মানুষজন কম ও দুই, আজকে আনিকার মনটা অনেক ভালো।  

তুমি আর তো কারো নও শুধু আমার

যত দূরে সরে যাও রবে আমার।

স্তব্ধ সময়টাকে ধরে রেখে

স্মৃতির পাতায় শুধু তুমি আমার।

কেন আজ এত একা আমি

আলো হয়ে দূরে তুমি।

আলো আলো আমি কখনো খুঁজে পাবনা,

চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না।

আলো আলো আমি কখনো খুঁজে পাবনা,

চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না।

হবে না হবে না, হবে না…………    

এই গান  আনিকা কখনো বান্ধবীদের সামনে  গায়  না ।  গুন গুন করে ওয়াশরুমেই গায়। আনিকা  তাহসানের  অনেক  বড় একজন ফ্যান ।আগে  মাঝে মাঝে  ওর  মিথিলা হওয়ার ইচ্ছা করত । কিন্তু এখন  আর আনিকার সেই ইচ্ছা নেই। “আনিকা” হিসবেই সে খুশি।

মানুষ তাঁর চেয়ে তুলনা মূলক সফল কারো স্থানে নিজেকে বসিয়ে কল্পনা করতে ভালবাসে।অন্যের মত হওয়ার চেষ্টা করেই মানুষ ভুলটা করে।ভুলটাও হয় ধাপে ধাপে। প্রথমে আকাঙ্ক্ষা তার পর তুলনা এরপর জেলাসি।আনিকা এই ব্যাপারটা কিছুদিন আগে একটা বই পড়ে জেনেছে। তাই সে ঠিক করেছে এখন থেকে সে আর কখনো কারো মত হতে চাইবে না। নিজের বেস্ট ভার্সন টা সে হওয়ার চেষ্টা করবে।হ্যাঁ, আইডল থাকতে পারে লাইফে।কিন্তু হুবহু তাঁর মতই জীবন হতে হবে এমনটা এখন আর আনিকা বিশ্বাস করে না। প্রত্যেকটা মানুষেরই আত্মশক্তি রয়েছে।আনিকা তাঁর এই শক্তি কাজে লাগাতে চায়। নিজের সাথে নিজের এই কথা বলার দীক্ষাটা সে পেয়েছে ইমতিয়াজ ভাইয়ার কাছ থেকে। এজন্য আলাদা ভাবে ইমতিয়াজ ভাইয়াকে এখনো ধন্যবাদ দেওয়া হয় নি। আজকে দেখা  হওয়া মাত্রই “ধন্যবাদ” দিবে বলে মনস্থির করেছে সে।

বাসা থেকে রিক্সা নিয়ে মালিবাগের উদ্দ্যেশে রওনা দিল আনিকা।আজকে খুব সুন্দর করে সেজেছে সে।নিজেকে সুন্দর করে সাজানোর মধ্যে একটা আর্ট আছে।অনেকে এটা স্বীকার করতে চায় না।সেটা “অনেকের”  দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। আনিকার  দৃষ্টিভঙ্গি  এক্ষেত্রে আলাদা।

একটা মেয়ে সুন্দরকরে সাজলে নিজের ভেতরে দুইটা চরিত্রের  যেকোন  একটি  চরিত্র  কাজ করে। এক শ্রেণী  ভাবে আমি এত রূপবতী সবাই আমার অবশ্যই প্রশংসা করবে  ,আমি ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব মেয়ে থার্ড ক্লাস, কিঞ্চিৎ দাম্ভিকতা ও অনেকের মাঝে ফুটে উঠে। আরেক শ্রেণী  ভাবে সৌন্দর্য দুই প্রকার এক ভৌত  ও দুই মনো রাসায়নিক।বাহ্যিক  সৌন্দর্যকে ভৌত  সৌন্দর্য  ও  মনের  সৌন্দর্যকে  মনো রাসায়নিক  সৌন্দর্য বলা যায়। মেক আপ করে ভৌত  সৌন্দর্য  শ্রী বৃদ্ধি ঘটানো যার আর  বই  পড়ে  ও  প্রজ্ঞার  চর্চা করে  মনের সৌন্দর্য  বাড়ানো  যায়।  যার মধ্যে  এই  দুই সৌন্দর্য  বর্তমান  সে নিজেকে  রূপবতী  হিসবে  দাবী  করতে পারে।এই শ্রেণীর মেয়েরা বাকি মেয়েদের কে সম্মান দিয়ে কথা বলে, এদের কখনো আপনি রূপ নিয়ে বড়াই করতে দেখবেননা, এরা যে পরিমান সময় ও অর্থ বাহ্যিক  সৌন্দর্য  বর্ধনে  ব্যয় করে  তার চেয়ে  একটু বেশি হলেও  মনের  সৌন্দর্য  বর্ধনে করে। আনিকা  পরের শ্রেণির সদস্য।

আনিকা ১ ঘণ্টা আগেই বাস স্ট্যান্ডে এসে হাজির। “সম্ভবত ইমতিয়াজ ভাইয়াও  কাছা কাছি চলে এসেছেন”।  আনিকা তাঁর ভাবনার যথার্থতা  প্রমাণের জন্য কল করল ইমতিয়াজ কে । 

কয়েক বার  রিং  হওয়ার পর  ইমতিয়াজ ফোন পিক  করলো।

“  ভাইয়া ,আপনার  আসতে  কতক্ষণ  লাগবে?  আমি  বাস  স্ট্যান্ডে  দাঁড়িয়ে আছি ।”

“  ঘুম কাতুরে  কণ্ঠে  ইমতিয়াজ  বলল আমার আর  আর বেশিক্ষণ  লাগবে না , আনিকা । আমি  ১০  মিনিটের মধ্যেই  চলে আসবো।  তুমি  কাউন্টারে  সাবধানে  থেকো।  আমি  চলে আসছি । “

“ আচ্ছা , আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।” বলে  আনিকা  ফোন  কাটে।

“পুরুষ মানুষ যখন মিথ্যা বলে তখন তাঁরা বেশি কথা বলে । ইমতিয়াজ  ভাইয়া  এখনো  ঘুমাচ্ছে  এটা আমি শিউর । ১০ মিনিটের মধ্যে যে  আপনি  আসবেন না  এটাও  আমি  জানি ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠাও বা উবারে করে আসতে মিনিমাম এখন থেকে মিনিমাম ৩০ মিনিট লাগবে।”, প্যাসেঞ্জার ওয়েটিং রুমে বসে আনিকা বিড় বিড় করে বলতেছিল।কেউ শুনে ফেলে নি তো আবার!   

আনিকার ফোনে ঘুম ভাঙ্গে ইমতিয়াজের।তাড়াতাড়ি করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য টয়েটের সামনে গিয়ে দেখে বিশাল লাইন।এই লাইন শেষ হতে আরও মিনিমাম ১ ঘণ্টা লাগবে। ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিবে,ওই দিকে প্যান্ট শার্ট কিছুই স্ত্রী করা হয়নি এখনো। 

আহলে কি বাস মিস করতে যাচ্ছে ইমতিয়াজ!!  

( ৩য় পর্ব সমাপ্ত )

এই গল্পের পরবর্তী পর্ব গুলো এখানে ক্রমান্বয়ে যুক্ত হবে। <3